নিজস্ব প্রতিবেদক:
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশবাসী যদি তাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তাহলে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
রোববার এক নির্বাচনী ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রের বরাতে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল, যা দেশের অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লুটপাটকৃত অর্থ ফেরত আনার ঘোষণা দিলেও অবহেলা ও অদক্ষতার কারণে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং ফ্যাসিবাদী শাসনের সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও তথাকথিত বিশেষজ্ঞের অন্তর্ঘাতমূলক ভূমিকায় অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ফ্যাসিস্ট আমলে লুট ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়মুক্তি থাকবে না। ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, সুবিধাভোগী আমলা ও তাদের আত্মীয়স্বজন—সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি ক্ষমতায় এলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে। সার্ক পুনর্জীবিত করা, আসিয়ানে যোগদানের উদ্যোগ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার কথাও জানান তিনি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন বাংলাদেশ মিশন স্থাপন, কূটনীতিক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বল্প ব্যয়ে জনবল রপ্তানির মাধ্যমে প্রবাসীদের সুরক্ষা ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন সরকারের দায়িত্ব বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেট ভেঙে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কৃষক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা যেন কোনো চাঁদা বা তোলা না দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে পারে, সরকার তা নিশ্চিত করবে। ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারী আমলে পুলিশ দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। হত্যা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও দুর্নীতিতে জড়িত পুলিশ সদস্যদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনো আফগানিস্তান হবে না। মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী কিন্তু উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে—যেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে ঘরের ভেতর পর্যন্ত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে এবং রাজনীতি ও প্রশাসনের সব স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে।
কৃষি খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সার ও বীজ বিতরণে সিন্ডিকেট ভাঙা হবে এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে এসব উপকরণ পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষি ঋণ গ্রহণে হয়রানি ও ঘুষ বন্ধ করে সহজ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করা হবে।