নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মারধর ও থানায় নিয়ে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় খুলশী থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই)সহ তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)।
অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে ঢাকায় থেকে চট্টগ্রামে ফেরেন নাঈম হাসান। রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে পুলিশের সদস্যরা অটোরিকশাটি থামান।
নাঈমের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে চালকের কাগজপত্র পরীক্ষা করেন। এরপর তাঁকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিলেও এবং পরিচয়পত্র দেখালেও তা উপেক্ষা করা হয়।
ক্রিকেটার নাঈম হাসানের অভিযোগ, খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে তাঁর কোমরে আঘাত করেন। একই সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা এক ব্যক্তি, যাকে পুলিশ সোর্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, পাইপ দিয়ে তাঁকে মারধর করেন।
নাঈম জানান, ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও অভিযানে থাকা ব্যক্তিরা তা আমলে নেননি। বরং তাঁকে আসামি আখ্যা দিয়ে চুপ থাকতে বলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে তাঁকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করা হয়। পরে তাঁকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে ওসির কক্ষেও তিনি হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে ওসি তাঁকে বারবার নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলেন।
থানায় নেওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হলে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বিসিবির কর্মকর্তারা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানান তিনি।
ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট অটোরিকশার বিরুদ্ধে চোরাচালানের তথ্য ছিল। তবে সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল এবং অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যরা নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে কিছু ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে সোনার চোরাচালানের তথ্য পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন।
নাঈম হাসানের বাবা মাহবুবুল আলম অভিযোগ করেন, ছেলের খবর পেয়ে থানায় গেলে তাঁর সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন।
ঘটনার পর মধ্যরাতে থানার সামনে নাঈমের স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরা জড়ো হন। তারা জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। এতে মারধর ও অপহরণচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, অভিযানের বিষয়ে তাঁকে আগে জানানো হয়নি। নাঈমকে থানায় আনার পর তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তবে ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বজনরা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত থানায় অবস্থান করেন।
ওসি জানান, অভিযোগের পরপরই এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং অভিযানে অংশ নেওয়া আরও এক কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রিকেট অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।