নিজস্ব প্রতিবেদক:
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে এবং এখন বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা ইন্টারপোলে আবেদন করে এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়।
তিনি জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো আবুধাবি বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে দণ্ডবিধির প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডারের সংশ্লিষ্ট বিধান।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্রও বেনজীরের গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলাসহ তার বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও একাধিকবার পাসপোর্টের আবেদনপত্রে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছিলেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজেকে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’-এ কর্মরত বলে উল্লেখ করে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেন, যদিও দায়িত্বের কারণে তার সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহারের সুযোগ ছিল।
তদন্তে উঠে এসেছে, ডিআইজি, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরবর্তীতে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একাধিকবার পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন তিনি। প্রতিবারই সরকারি পরিচয়ের পরিবর্তে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তথ্য প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বেনজীরের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকার পরও প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই তার পাসপোর্ট অনুমোদন করেন।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তিনি বলেন, “অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই ঘটনা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বেনজীর আহমেদকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক কার্যক্রমের মুখোমুখি করা হবে।