নিজস্ব প্রতিবেদক:
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যাপক কর-শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে একদিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করতে শতাধিক পণ্য ও সেবায় কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, কৃষি উপকরণ, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নিত্যপণ্যে স্বস্তির সম্ভাবনা
দ্রব্যমূল্যের চাপ কমাতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিজাত পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর থাকলেও নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যয় কমে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের খরচ কমবে এবং ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে খেজুর কিনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আমদানিনির্ভর মসলার বাজারেও স্বস্তি আসতে পারে। দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ সব ধরনের মসলা আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষকদের জন্য ব্যয় কমানোর উদ্যোগ
কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জিংক সালফেট সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কীটনাশক উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং আমদানি করা কীটনাশকের ওপর অগ্রিম কর মওকুফের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পোল্ট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালকে শূন্য শুল্ক সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে।
পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ফলে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিশুখাদ্য ও ওষুধে মূল্য হ্রাসের আশা
শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় কমে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেতে পারে।
ওষুধ শিল্পেও বড় ধরনের সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫১টি নতুন উপকরণের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের পাশাপাশি আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে শূন্য শুল্ক সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ তৈরির নয়টি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বড় পদক্ষেপ
স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।
হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর অগ্রিম করও তুলে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হার্টের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত স্টেন্টের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
চোখের ছানি অপারেশনে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যে বড় ছাড়
ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ওপর প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসতে পারে।
কম্পিউটারের এসএসডি আমদানিতেও অধিকাংশ শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সার্ভার আমদানিতে কর অব্যাহতি এবং পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের আমদানি শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব যানবাহনে উৎসাহ
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশে নামানো হতে পারে।
প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রেও করহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর বিদ্যমান প্রায় ৪০ শতাংশ করভার পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।
সংস্কৃতি ও সৃজনশীল খাতেও সুবিধা
গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমা ক্যামেরার আমদানি শুল্কও উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য করমুক্ত সুবিধা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাধীন চলাচল ও দৈনন্দিন জীবন সহজ করতে ব্যবহৃত ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক, কর ও অগ্রিম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকে উৎসাহিত করার লক্ষণ স্পষ্ট। তবে এসব সুবিধার প্রকৃত প্রভাব কতটা বাজারে প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে বাজেট অনুমোদন ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতার ওপর।