নিজস্ব প্রতিবেদক:
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান-এ পবিত্র ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
শনিবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত এ জামাতে ইমামতি করেন বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। নামাজ শুরুর আগে শোলাকিয়ার ঐতিহ্য অনুযায়ী বন্দুকের ফাঁকা গুলির মাধ্যমে জামাত শুরুর সংকেত দেওয়া হয়।
ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী আলী আকবর আকন্দ টানা ৫৭ বছর ধরে পায়ে হেঁটে শোলাকিয়ায় এসে ঈদের নামাজ আদায় করছেন। কৈশোরে চাচার হাত ধরে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজও অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
একইভাবে ত্রিশাল উপজেলার ইদ্রিস আলীও প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই জামাতে অংশ নিচ্ছেন। তাদের মতো অসংখ্য মুসল্লি দূর-দূরান্ত থেকে এক বা দুই দিন আগে কিশোরগঞ্জে এসে জড়ো হন, যাতে সময়মতো জামাতে অংশ নিতে পারেন।
নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত মুসল্লিরা জানান, বড় জামাতে নামাজ আদায় ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তারা এখানে এসেছেন। অনেকের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা এবার পূরণ হয়েছে বলে তারা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
ভোর থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে। সকাল ৯টার মধ্যেই প্রায় তিন লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন অনেকেই। কিছু মুসল্লি জায়গার সংকট ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেন।
জামাত নির্বিঘ্ন করতে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মোতায়েন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, এপিবিএন, আরআরএফ, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি এবং জেলা পুলিশের প্রায় ১১০০ সদস্য।
মাঠের ভেতর ও বাইরে স্থাপন করা হয় অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা, ড্রোনের মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নিরাপত্তা তদারকি করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের ব্যাগ বা ছাতা নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল; শুধুমাত্র জায়নামাজ নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, “লাখো মুসল্লি স্বস্তিতে ও শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় করেছেন। প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।”
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার এসএম ফরহাদ হোসেনও নির্বিঘ্ন আয়োজন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নামাজ শেষে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পাশাপাশি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য দোয়া করা হয়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুঘল আমলে এ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ টাকা—সেখান থেকেই ‘শোলাকিয়া’ নামের উৎপত্তি। আবার ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের ঘটনাও এ মাঠের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
দীর্ঘ ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগে জড়িয়ে থাকা শোলাকিয়ার ঈদ জামাত আজও দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশগুলোর অন্যতম হিসেবে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।