June 27, 2026, 7:15 am

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়: সাংবিধানিক সংস্কারের পথে নতুন অধ্যায়

  • Update Time : Friday, February 13, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে দেশের জনগণ। শুক্রবার নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় সংবিধানের ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলো। মোট ১২ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে ৬০.২৬ শতাংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ পক্ষে পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখের বেশি ভোট, আর ‘না’ পক্ষে ২ কোটি ২৫ লাখের কিছু বেশি ভোট।

এই গণরায়ের ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার কিছু অংশ পুনর্বিন্যাস করে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাকে আরও কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমবে এবং জবাবদিহিতা বাড়বে।

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন। বর্তমানে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিবর্তে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ নিয়ে নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। নিম্নকক্ষ থাকবে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, আর উচ্চকক্ষে থাকবেন অভিজ্ঞ ও খ্যাতিমান নাগরিকরা—যারা আইন প্রণয়নে পর্যালোচনামূলক ভূমিকা রাখবেন। এর ফলে কোনো আইন পাসের আগে দ্বিস্তরীয় যাচাই-বাছাই নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান–এর সংসদীয় কাঠামোতেও।

সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সিদ্ধান্তও এই গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে। এতদিন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। সংশোধনের ফলে সংসদ সদস্যরা নিজেদের বিবেচনা ও নির্বাচনী এলাকার স্বার্থ অনুযায়ী অধিক স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও আসছে স্বচ্ছতা। নির্বাচন কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি বা সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করার বিধান যুক্ত হবে। এতে প্রশাসনিক প্রভাব কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা জোরদার হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

মৌলিক অধিকার সংরক্ষণেও জোর দেওয়া হয়েছে সংস্কার প্রস্তাবে। বাকস্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের অধিকার এবং ডিজিটাল পরিসরে নাগরিক স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে আরও সুরক্ষিত হবে। কোনো সরকার যাতে নির্বিচারে এসব অধিকার খর্ব করতে না পারে, সে লক্ষ্যে নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই গণভোটকে তার বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান সংশ্লিষ্ট। গণভোটে জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে সেই প্রস্তাবগুলো এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই গণরায় কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত রূপান্তরের পক্ষে জনগণের স্পষ্ট অবস্থান নির্দেশ করে। এর মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com