নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধস-এর ১৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারে বহুতল ভবন ধসে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক; আহত ও পঙ্গু হন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবার এবং বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও বিচার থেকে বঞ্চিত।
ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে অপূর্ণতা
ধসের পর দেশি-বিদেশি সংস্থা ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সহায়তায় গঠিত রানা প্লাজা ডোনার্স ট্রাস্ট ফান্ড থেকে কিছু অর্থ বিতরণ করা হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি—এটি প্রকৃত ক্ষতিপূরণ নয়, বরং অনুদানমাত্র। শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সম্ভাব্য সারাজীবনের আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের কথা থাকলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
অনেক আহত শ্রমিক, বিশেষ করে যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতেই প্রাপ্ত অর্থ শেষ হয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি
ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষী থাকলেও ১৩ বছরেও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়নি। প্রধান আসামি ভবন মালিক সোহেল রানাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়নি।
আইনি জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে সময়ের ব্যবধানে অনেক সাক্ষীর স্মৃতি ক্ষীণ হয়ে গেছে, কেউ কেউ অনুপস্থিত থাকছেন—যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
শ্রমিক নেতাদের ক্ষোভ
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, “১৩ বছরেও নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের খোঁজ কেউ রাখেনি। রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করেনি।” তিনি পুনর্বাসনের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সংকট এবং ক্ষতিপূরণ বাস্তবায়নে ব্যর্থতাকে “চরম দুঃখজনক” বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ এখনো অমানবিক। শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আংশিক উন্নতি
রানা প্লাজার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে Accord on Fire and Building Safety ও Alliance for Bangladesh Worker Safety গঠনের মাধ্যমে ভবন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের সার্বিক পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর কনভেনশন অনুযায়ী যে মানদণ্ড বাস্তবায়নের কথা, তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
প্রশ্ন রয়ে গেছে
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি ছিল দুর্বল তদারকি, অব্যবস্থাপনা এবং লোভের পরিণতি। ১৩ বছর পরও শ্রমিকদের প্রশ্ন একই—কবে মিলবে ন্যায়বিচার? কবে নিশ্চিত হবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা?
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা, প্রকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং শ্রমিকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নই হতে পারে এই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর নিশ্চয়তা থাকবে না।