নিজস্ব প্রতিবেদক:
পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটির এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও রূপান্তরের একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
পররাষ্ট্রনীতি : সম্মান, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের ওপর জোর
জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘোষিত ইশতেহারে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করেছে। দলটির অঙ্গীকার অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি নাগরিকদের মর্যাদা বাড়াতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির ওপর।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা
জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংস্থায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সার্ক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতেও বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দেশের অংশগ্রহণ চালু রাখার কথা বলা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি বৈধ ও স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাত : ভিশন ২০৪০ ও শতভাগ আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য
প্রতিরক্ষা খাতে জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম মূল আকর্ষণ ‘ভিশন ২০৪০’। বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
এই নীতির আলোকে বিদ্যমান ভিশন ২০৩০ পুনর্গঠন করে নতুন সামরিক ডকট্রিন ও ভিশন ২০৪০ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ইশতেহারে একটি জাতীয় সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।
দলটি প্রতিরক্ষা বাজেট পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অস্ত্র উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ঘোষণায় বলা হয়, ২০৪০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা হবে।
নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
ইশতেহারে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আধুনিকীকরণ ও পুনর্বিন্যাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে মাদক চোরাচালানসহ সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার করা হয়েছে।
তরুণ সমাজকে শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সিদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে ৬ থেকে ১২ মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়টিও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যায়ক্রমে সেনাসদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী বলছে, তাদের এই ইশতেহার একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা।