নিজস্ব প্রতিবেদক:
অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
বুধবার (১০ জুন) প্রকাশিত বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি ছিল ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার বা ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
জিডিপির আকার বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রবৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি খাত অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ২ দশমিক ৪২ শতাংশের তুলনায় বেশি। খাদ্য উৎপাদন, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এই খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে সহায়তা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশে। ব্যাংকিং, বাণিজ্য, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সেবাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।
তবে শিল্প খাতের চিত্র তুলনামূলকভাবে কিছুটা হতাশাজনক। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে, যেখানে আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগের ধীরগতিকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের সূচকে কিছুটা উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে। জিডিপির তুলনায় মোট বিনিয়োগের অনুপাত আগের অর্থবছরের ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে দেশজ সঞ্চয়ের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশে।
জাতীয় সঞ্চয়ের হারেও নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ হিসাবে দেশের মোট জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের হার বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শিল্প খাতের গতি বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সঞ্চয় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতির আকার বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে আগামী দিনে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে উৎপাদনশীল খাত, বিনিয়োগ এবং সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।