আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উন্নত জীবন ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী। স্পেনের উপকূলে পৌঁছানোর পথে আটলান্টিক মহাসাগর ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক রুটে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে অভিবাসন পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা কামিনান্দো ফ্রোন্তেরাস।
বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় মোট ১ হাজার ৩১৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪২ জন নারী এবং ১২৯ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া অন্তত ২৭টি নৌযান যাত্রীসহ নিখোঁজ হয়েছে, যাদের ভাগ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হলো, যখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন পোপ লিও। সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন সংকট এবং ইউরোপমুখী মানুষের দুর্দশা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। গত এক দশকে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই রুটটি আরও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিবছর শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।
চলতি সপ্তাহে স্পেন সফরকালে পোপ লিও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিবাসীদের দুর্ভোগকে এমন একটি মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেন, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং মৌরিতানিয়াসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ বৃদ্ধির ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কোস্ট গার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে তারা দীর্ঘ সমুদ্রপথে ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় যাত্রা করছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কামিনান্দো ফ্রোন্তেরাস জানিয়েছে, ২০২৫ সালেও স্পেনের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টায় ৩ হাজার ৯০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রুট বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসনপথে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের ন্যূনতম দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া, শক্তিশালী স্রোত এবং নৌযানের অনিরাপদ অবস্থা যাত্রাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তোলে। এছাড়া অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে স্পেনে প্রবেশের জন্য প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত জলপথ সাঁতরে বা ছোট নৌকায় পার হওয়ার ঝুঁকিও নিয়ে থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আফ্রিকার বহু মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। তবে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার অভাবে তারা জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যার মাশুল হিসেবে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য আরও নিরাপদ পথ, কার্যকর উদ্ধার তৎপরতা এবং মানবিক নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের এই মানবিক বিপর্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।