নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকার চলতি বছর কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়ালেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে এসে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মসজিদ-মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ কোরবানিদাতারা অভিযোগ করেছেন—নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুরে রাজধানীর মালিবাগ, শ্যামলী ও হাজারীবাগ এলাকার কয়েকটি অস্থায়ী চামড়া সংগ্রহকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে সংগ্রহ করা এসব চামড়ার অনেকগুলো এখনও বিক্রি হয়নি। কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা গেছে।
শ্যামলীর একটি অস্থায়ী সংগ্রহকেন্দ্রে চামড়া বিক্রি করতে আসা মো. রাশেদ বলেন, “গত বছর যে চামড়া ১ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি, এবার সেটার জন্য ৮০০ টাকার বেশি কেউ বলছে না। সরকার দাম বাড়ালেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব নেই।”
মালিবাগ এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী আবদুল কাইয়ুম জানান, ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকেই কম দামে চামড়া কেনার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন, “বেশি দামে কিনলে পরে লোকসান গুনতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে কিনছি।”
ছাগলের চামড়ার পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শ্যামলীর আরেক ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া বলেন, “ছাগলের চামড়া তো প্রায় কেউ কিনতেই চাচ্ছে না। অনেকে বিনামূল্যেও দিয়ে দিচ্ছেন। সংরক্ষণ খরচই উঠবে না।”
তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। হাজারীবাগ এলাকার এক আড়তদার বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা বেশি দামে চামড়া কেনা হচ্ছে। তবে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ঠিকমতো লবণ ব্যবহার না করায় চামড়ার মান নষ্ট হচ্ছে, ফলে দাম কমে যাচ্ছে।”
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পরে এসব চামড়া কিনে নেন আড়তদার ও ট্যানারি প্রতিনিধিরা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নগদ অর্থ সংকট, ট্যানারিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ১৩ মে চামড়া খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে চলতি বছরের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে সরকার। নির্ধারিত দামে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
সরকারি হিসাবে ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতি পিসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চামড়া খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের মৌসুমে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি ও ট্যানারি খাতে নগদ অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত না হলে সরকার ঘোষিত মূল্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।