নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরে ৬ বিলিয়নের বেশি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (১৯ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সাড়ে আট কোটি মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে। মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে পরিচালিত এ নিলামে ডলারের বিনিময় হার ও কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
সবমিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৬০৬ কোটি মার্কিন ডলার বা ৬.০৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু মে মাসেই কেনা হয়েছে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি রয়েছে। এ অবস্থায় ডলারের দাম যাতে অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায় এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। একই সঙ্গে এ ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে।”
ডলার সংকট থেকে উদ্বৃত্তে বাজার
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে দেশে ডলারের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। সে সময় প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়।
গত তিন অর্থবছরে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। বিপরীতে ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছিল মাত্র প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থপাচার রোধে কঠোর নজরদারি, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের উন্নতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবে দর কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রেমিট্যান্সে ধারাবাহিক উল্লম্ফন
চলতি অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় উত্থান দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
জুলাইয়ে এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার
আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার
সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার
অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার
নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার
ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার
জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার
ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার
মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার
এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার
বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি এবং হুন্ডি দমনে সরকারের পদক্ষেপের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।
রিজার্ভে বড় উত্থান
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় উত্থান হয়েছে। ১৯ মে দিনশেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। পরে ধারাবাহিকভাবে কমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের সময় তা নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
রপ্তানি আয়েও শক্ত অবস্থান
এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত এপ্রিল মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। গত বছরের এপ্রিলে রপ্তানি আয় ছিল ৩০১ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে সামনের মাসগুলোতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হতে পারে।