June 27, 2026, 4:19 am

সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

  • Update Time : Sunday, May 17, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং দীর্ঘদিনের লাগামহীন আর্থিক অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একের পর এক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের আর্থিক খাত নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশের মোট ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।

তবে তিন মাস আগেও পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। যদিও শেষ প্রান্তিকে কাগজে-কলমে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, এটি প্রকৃত উন্নতি নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সহায়তার ফল।

ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গেলে তাকে মূলধন ঘাটতি বলা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) গত ডিসেম্বর শেষে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভয়াবহ এই মূলধন সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ লাগামহীন খেলাপি ঋণ। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিপুল এই খেলাপি ঋণের চাপেই ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থা, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে এই সংকট তৈরি হয়েছে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক লুটপাটে অনেক ব্যাংক ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে জনতা ব্যাংকের, যার পরিমাণ ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, যার পরিমাণ ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকেও বড় ধরনের মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে। এসব ব্যাংকের মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, যার পরিমাণ ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এছাড়া এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে বিশেষায়িত খাতের দুটি সরকারি ব্যাংকও বড় অঙ্কের মূলধন সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

তবে তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল নীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন কমেছে। যেহেতু মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখতে হয়, তাই এই চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কিছুটা কম দেখাচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, পুনঃতফসিল বা বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানো গেলেও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

এদিকে ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমাগত মূলধন সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দেশের ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com