নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
“আমি সেদিন মারা গেলে হয়ত আমার বড় করে জানাজা হতো, স্মৃতিচারণ হতো, অনেকে ভালো কথা বলত, আফসোস করত। তারেক রহমানও হয়ত জানাজায় আসতেন অনেক কথার ফাঁকে হয়তো বলতেন ভিপি হানিফের পরিবারের দায়িত্ব আমি নিলাম। কিন্তু আমি মারা যাইনি, তাই অনেকে দেখতে আসারও প্রয়োজন মনে করেননি। কেউ কেউ এসেছেন, কিন্তু অনেকে খবরও রাখেননি।”— অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এবং শারীরিক যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ, যিনি রাজনৈতিক মহলে ‘ভিপি হানিফ’ নামেই সমধিক পরিচিত।
সরকারি তিতুমীর কলেজের সাবেক এই জনপ্রিয় ভিপি দীর্ঘ দেড় মাস ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণার সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। কিন্তু শরীরের ক্ষতের চেয়েও মনের ক্ষত যেন তাকে বেশি পোড়াচ্ছে। রাজনীতির মাঠের এই সাহসী লড়াকু আজ হাসপাতালের নিভৃত বিছানায় একাকীত্বের বিলাপ করছেন।
রাজপথ থেকে হাসপাতালের বিছানায়
গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনে প্রচারণার গুরুদায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মহাখালীতে প্রচারণাকালে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন হানিফ। একটি মাইক্রোবাসের চাকা তার ডান পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় হাড় ও মাংস। এরপর কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হলেও মুক্তি মেলেনি যন্ত্রণা থেকে। ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ায় ধাপে ধাপে পা থেকে পচা মাংস কেটে ফেলতে হচ্ছে।
অপারেশন থিয়েটারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, “অসহ্য যন্ত্রণা! যতবার অপারেশন টেবিলে নেয়, ততবার মনে হয় বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই হয়ত ভালো ছিল!”
ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এক রাজনৈতিক জীবন
ভিপি হানিফের রাজনীতিতে আসা কোনো ক্ষমতা বা পদের লোভে ছিল না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শিষ তুলে দিয়ে যে ভালোবাসার শুরু, তা আজও অটুট। তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের দু’বারের সভাপতি এবং বিপুল ভোটে ভিপি নির্বাচিত হওয়া হানিফকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে মহানগর উত্তর বিএনপির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে অন্তত ৭ বার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। হামলা, মামলা আর নির্যাতনেই কেটেছে তার জীবনের সোনালী সময়গুলো। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
নেতার প্রতি শেষ আকুতি
নিজের এই চরম দুর্দিনেও দল আর নেতার চিন্তাই তার মাথায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি গভীর মমতা আর উদ্বেগ নিয়ে তিনি বলেন, “চাওয়া-পাওয়ার জন্য রাজনীতি করিনি। মানুষ ভালোবাসে এটাই শান্তি। তবে আমাদের নেতার কাছে একটা বড় আবেদন— আপনি আপনার নিরাপত্তার বিষয়টি খুব কঠোরভাবে খেয়াল রাখবেন। সবাইকে বিশ্বাস করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমান সকলকে বিশ্বাস করেছিলেন, আপনি সেই ভুল করবেন না।”

ভিপি হানিফের এই আর্তনাদ আজ শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং রাজনীতির মাঠে জীবন বাজি রাখা হাজারো ত্যাগী কর্মীর মনের প্রতিধ্বনি। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের সাদা বিছানায় শুয়ে তিনি আজ শুধু একটু সহমর্মিতা আর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার দোয়া চাইছেন।