আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা ‘পুড়িয়ে দেওয়া হবে’—এমন হুমকি দিয়েছেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক জেনারেল। আইআরজিসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া পোস্টে জেনারেল সরদার জব্বারি বলেন, তেলের পাইপলাইনেও হামলা চালানো হবে এবং অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। তার দাবি, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা Agence France-Presse (এএফপি) জানায়, চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে প্রণালিটি দিয়ে যাতায়াতে অনীহা বাড়ছে নাবিকদের মধ্যে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ফলে এখানে চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
তবে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর-এর জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দশম বৃহত্তম এই কনটেইনার বন্দরটি মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের জন্য পুনর্বণ্টন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ছোট জাহাজে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারত পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয় এখান থেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাসে কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি হরমুজ প্রণালি। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ট্যাঙ্কার হামলার ঘটনা ঘটলেও বাণিজ্যিক চলাচল অব্যাহত ছিল। ফ্রান্সের সামুদ্রিক গবেষণা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে তা হবে নজিরবিহীন ঘটনা।
সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার পর বিশ্বের শীর্ষ শিপিং কোম্পানিগুলো—ইতালিয়ান-সুইস এমএসসি, ডেনমার্কের মায়েরস্ক, ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম, জার্মানির হাপাক লয়েড এবং চীনের কসকো—তাদের জাহাজ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সাইটগুলোতে দেখা গেছে, কুয়েত উপকূল ও দুবাই সংলগ্ন এলাকায় বহু তেল ট্যাঙ্কার নোঙর করে আছে।
এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো এই পথ দিয়ে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, খাদ্যশস্য, বিলাসপণ্য ও শিল্পপণ্য রপ্তানি করে। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল-গ্যাস ছাড়াও বিশ্ব অ্যালুমিনিয়াম চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করা হয়।
বিভিন্ন অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহে বিলম্বের সতর্কবার্তা দিয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকি চার্জ আরোপ করায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কায় ইউরোপ-এশিয়া রুটের জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল করছে, এতে সময় বাড়ছে প্রায় ১০ দিন এবং খরচ বাড়ছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।