আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের পক্ষ থেকে নতুন সরকারকে সতর্ক কিন্তু উষ্ণ শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে অভিনন্দন জানিয়ে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদারের ইঙ্গিত দেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি কূটনৈতিক বার্তা হলেও ভাষায় ছিল সতর্কতা।
অবিশ্বাসের পটভূমি
দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন নতুন নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, পানিবণ্টন ইস্যু, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ও কূটনৈতিক উত্তাপ—সব মিলিয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
বর্তমানে ভিসা কার্যক্রম সীমিত, আন্তঃদেশীয় বাস-ট্রেন চলাচল স্থগিত এবং বিমান যোগাযোগও কমে এসেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়।
বিএনপি—ভারতের জন্য ‘পরিচিত কিন্তু অনিশ্চিত’?
লন্ডনের SOAS University of London-এর অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বিবিসিকে বলেন, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী দল হিসেবে ভারতের জন্য একটি ‘বাস্তবসম্মত’ অংশীদার হতে পারে। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন—তারেক রহমান কীভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবেন, সেটিই হবে মূল বিষয়।
অতীতে খালেদা জিয়া-র নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময় দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা দেখা গিয়েছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যু ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তখন অবিশ্বাস তৈরি হয়।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও আঞ্চলিক ভারসাম্য
হাসিনার পতনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। সরাসরি ফ্লাইট চালু, উচ্চপর্যায়ের সফর ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি—এসব ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক Institute for Defence Studies and Analyses-এর গবেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বলেন, “বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। উদ্বেগের বিষয় হলো—ভারসাম্য একদিকে থেকে অন্যদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া।”
হাসিনার উপস্থিতি—কূটনৈতিক জট
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান নতুন সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি হলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আরও উত্তেজনা দেখা দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
OP Jindal Global University-এর অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মন্তব্য করেন, দিল্লি যদি নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তবে তা দুই দেশের সম্পর্কে ঝুঁকি তৈরি করবে।
সামনে পথ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব—তবে এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সংযম, নিরাপত্তা সহযোগিতায় স্বচ্ছতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান।
নতুন সরকার ভারতবিরোধী মনোভাব কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার থেকে কতটা বিরত থাকে—তা-ই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সমীকরণ।
দুই প্রতিবেশীর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ একটাই—অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে বাস্তববাদী অংশীদারত্বে ফিরতে পারবে কি না।