June 27, 2026, 8:24 am

প্রবীণ ও এতিমদের পাশে মানবিক ডিসি

  • Update Time : Monday, January 12, 2026

জেলা প্রতিনিধি:

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাঁরা আপনজন হারিয়েছেন, হারিয়েছেন ঘর–পরিবার, তাঁদের জন্য একটি মানবিক স্পর্শই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া তেমনই অর্ধশতাধিক অসহায় প্রবীণের জীবনে আজ রোববার (১১ জানুয়ারি) যেন ফিরে এলো সেই হারিয়ে যাওয়া মানবিক উষ্ণতা। এই প্রথম জেলার শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা সরাসরি তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে শুধুই দায়িত্ব পালন নয়, ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিলেন।

শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—জেলার অভিভাবক হিসেবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত প্রবীণদের একজন একজন করে কাছে গিয়ে তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন, জীবনের গল্প শোনেন এবং নিজ হাতে শীতের কম্বল গায়ে জড়িয়ে দেন। জেলা প্রশাসকের ভালোবাসা ও পরম যত্নে মোড়ানো সবাইকেই সুস্বাদু ফলের ঝুড়িও দেন তিনি।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া চোখে তখন দেখা যায় কৃতজ্ঞতার জল—কারণ বহুদিন পর কেউ তাঁদের “মানুষ” হিসেবে মনে রেখেছে।

এ বিষয়ে বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সায়েরা বেগম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক এই বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে এসেছেন। সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, “ডিসি স্যার শুধু কম্বল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং নিজ হাতে প্রত্যেক প্রবীণকে কম্বল পরিয়ে দিয়েছেন। সুস্বাদু ফলের ঝুড়িও দেন তিনি।একজন মানবিক মানুষ না হলে এমনটা করা সম্ভব নয়।”
প্রতিটি ঝুড়িতে আংগুর, কমলা, আপেল ও কেক ছিল বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন সূত্র।

তিনি আরও যোগ করেন, “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি—তিনি সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।”

বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোলামুর রহমান রব্বানী বলেন, “প্রবীণ মানুষগুলোকে কেউ মনে রাখে—এই অনুভূতিটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। জেলা প্রশাসকের এই আন্তরিক উদ্যোগ আমাদের কাজের প্রতি নতুন করে আশাবাদী করেছে।”

কম্বল বিতরণের পাশাপাশি জেলা প্রশাসক ফলের ঝুড়ি বিতরণ করেন এবং প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিকিৎসা, শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক নগরীর কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানায় উপস্থিত হয়ে ৩২৫টি কম্বল এতিম শিশুদের মাঝে বিতরণ করেন। সেখানে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের পড়াশোনা, আবাসন ও সামগ্রিক কল্যাণ বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি।

কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার অধ্যক্ষ আবুল কাসেম বলেন, “জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি ও এই মানবিক সহায়তা আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। শিশুদের মুখের হাসিই প্রমাণ করে—এই ভালোবাসা কতটা মূল্যবান।”

এতিমখানা পরিচালনা কমিটির অর্থ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবসার চৌধুরী বলেন, “ডিসি স্যার নিঃসন্দেহে একজন মানবিক মানুষ। এতিম শিশুদের সংখ্যা জানার পরই তিনি তিন শতাধিক কম্বল পাঠিয়েছেন। তাঁকে খুব অমায়িক, ভদ্র ও আন্তরিক মনে হয়েছে। একজন মানবিক মানুষ না হলে নিজ উদ্যোগে এতিম ও অসহায়দের খোঁজ নেওয়া, দরখাস্ত আহ্বান করা এবং নিজ হাতে কম্বল বিতরণ করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলা প্রশাসকের মানবিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে। এতিমখানার হল সুপার আব্দুল মোবিনও জেলা প্রশাসকের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “চার দশকের দায়িত্বকালীন সময়ে এমন মানবিক জেলা প্রশাসক আমি দেখিনি। তিনি অত্যন্ত অমায়িক ও আন্তরিক। প্রতিটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের সমস্যার কথা জানতে চেয়েছেন।”

এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,“সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শীতবস্ত্রের সঙ্গে যদি সামান্য ভালোবাসা ও মানবিক স্পর্শ পৌঁছে দিতে পারি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।”

তিনি আরও বলেন,“এই শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের সম্মিলিত দায়িত্ব।”

এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com