রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে আলোচিত নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার বাড়িতে হামলা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, ও কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন ও পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো উপজেলায়—বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আতঙ্কে গোয়ালন্দ উপজেলার বেশিরভাগ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসাশিক্ষকরা এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ ছুটি নিয়েছেন, কেউ আবার কোনো অনুমতি ছাড়াই নিজেদের বাড়িতে বা নিরাপদ জায়গায় চলে গেছেন। পাশাপাশি অনেক বাজারে দোকানপাটও বন্ধ দেখা গেছে।
দৌলতদিয়া এলাকার একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন আজিম খাঁ জানান, “আমাদের ইমাম হাফেজ মনিরুজ্জামান শুক্রবারের ঘটনার পর থেকে মাগুরায় গ্রামের বাড়িতে আছেন। এখন আমি নামাজ পড়াচ্ছি।”
একইভাবে ইদ্রিসিয়া ইসলামিয়া জামে মসজিদের ইমাম মুফতি আব্দুল লতিফ চলে গেছেন মানিকগঞ্জে। গোয়ালন্দ বাজার বড় মসজিদের ইমাম ও উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আবু সাইদ জানিয়েছেন, তিনি এক আত্মীয়কে দেখতে গেছেন। তবে ফোনে তিনি বলেন, “নুরাল পাগলার মরদেহ নিয়ে যা হয়েছে, তা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি করছি।”
শুক্রবারের ঘটনার পর থেকেই গোয়ালন্দ বাজারের অনেক দোকানদার আতঙ্কে দোকান খুলছেন না। এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কোনো অন্যায় করিনি। তবুও ভয় হয়—হঠাৎ করে যেন কিছু না ঘটে যায়।”
সোমবার দুপুরে নুরাল পাগলার দরবার পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) মো. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, “নিরপরাধ সাধারণ জনগণকে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। ভিডিও ফুটেজ দেখে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর ফকির মহিউদ্দিন আনছার ক্লাব ময়দানে বিক্ষোভের ডাক দেয় উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি।
তাদের দাবি ছিল, নুরাল পাগলার দরবারে ইসলামবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ এবং তার ‘কাবা সদৃশ’ কবরটি ভেঙে নিচু করা।
সমাবেশে উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা মুসল্লিদের সংগঠিত করে অংশ নেন। তবে সমাবেশের একপর্যায়ে উশৃঙ্খল যুবকরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়, গাড়ি ভাঙচুর করে এবং মাজারে হামলা চালায়। পরে নুরাল পাগলার কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে তা পুড়িয়ে ফেলা হয়।
থানার এসআই সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এবং নিহত রাসেল মোল্লার বাবা আজাদ মোল্লা ৩৫০০ থেকে ৪০০০ অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, “ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কাউকে অযথা হয়রানি করা হবে না।”
উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বাজারে জনশূন্যতা ও নিরবতা যেন সেই আতঙ্কেরই প্রতিচ্ছবি।