June 27, 2026, 6:42 am

‘মাছ না মিললে চালও জোটে না’: হালদা পাড়ে সেলাই মেশিনে নতুন স্বপ্ন, পাশে মানবিক ডিসি জাহিদ

  • Update Time : Tuesday, May 19, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

হালদা নদীতে মাছ না মিললে অনেক সময় ঘরে চাল কেনার টাকাও থাকে না। দিন চলে অনিশ্চয়তায়, সংসারে নামে অভাব-অনটন। সেই বাস্তবতায় একটি সেলাই মেশিন যেন হালদা পাড়ের অনেক জেলে পরিবারের কাছে শুধু একটি যন্ত্র নয়—নতুন আশার নাম, বদলে যাওয়ার স্বপ্ন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) রাউজানে হালদা পাড়ের জেলেদের বিকল্প আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৭৫ জন জেলের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন, স্ট্যান্ড, চেয়ার ও ড্রাই আয়রন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও অসচ্ছল মানুষের মাঝে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে জেলে পরিবারের মানুষদের চোখের ভাষা—যেখানে ছিল স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যে বলেছিলেন, শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পেশায় আটকে থাকলে হবে না। পৃথিবী বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন যেন মিলেছে মৃদুল বড়ুয়ার পরিবারের মধ্যে।

জেলা প্রশাসকের হাত থেকে নতুন সেলাই মেশিন পেয়ে উচ্ছ্বাস লুকাতে পারেননি মৃদুল বড়ুয়া। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার পুরো পরিবার।

তিনি বলেন, “ডিসি স্যার আমাদের নতুন একটা সেলাই মেশিন দিয়েছেন। আমি আমার মেয়ে এবং ছেলের বউকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেব। তারা ঘরে বসে কাজ করলে সংসারে বাড়তি আয় হবে।”

তার পুত্রবধূ শর্মিলা বড়ুয়া বলেন, “শুধু মাছ ধরে পরিবার চালানো খুব কষ্টকর। আমি সেলাই কাজ শিখলে নিজেদের জামাকাপড় তৈরির পাশাপাশি অন্যদের কাজও করতে পারব। এতে সংসারের অভাব-অনটন কিছুটা হলেও কমবে।”

হালদা পাড়ের আরেক জেলে প্রদীপ জলদাশের কণ্ঠেও ছিল বাস্তবতার কঠিন গল্প। তিনি বলেন, “যখন মাছ ধরতে পারি না, তখন চাল কেনার টাকাও থাকে না।” তবে হাতে নতুন সেলাই মেশিন পেয়ে তার চোখে এখন ভিন্ন আলো।

“আমার মেয়ে তিন্নি সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এখন বাসায় বসেই কাজ করতে পারবে। মাছ ধরার আয়ের সঙ্গে সেলাইয়ের আয় যোগ হলে হয়তো সংসারের কষ্ট কিছুটা কমবে,” বলেন তিনি।

একই চিত্র বিধু বড়ুয়ার পরিবারেও। তার মেয়ে তিন্নি বড়ুয়া সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরিবারটির আশা—এই দক্ষতাই হয়তো বদলে দিতে পারে তাদের বাস্তবতা।

তিন্নির ভাই লিংকন বড়ুয়া বলেন, “বাবার একার আয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টকর। আমার বোন সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছে। কিন্তু বাবার পক্ষে তার জন্য সেলাই মেশিন কেনা সম্ভব ছিল না। ডিসি স্যারের কাছ থেকে এটি পেয়ে আমাদের অনেক উপকার হলো।”

হালদা পাড়ের জেলে পরিবারের গল্পগুলো যেন সারাদেশে মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বক্তব্যকেই নতুনভাবে সামনে আনে। তিনি বলেছিলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোয় নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই, যখন সাধারণ মানুষের জীবন বদলাবে।

রাউজান উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষা উপকরণ এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২১ জন উপকারভোগীর মধ্যে ৫০ হাজার টাকার এককালীন আর্থিক সহায়তাও বিতরণ করা হয়।

হালদা পাড়ে সেদিন হয়তো শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ হয়নি; অনেক পরিবার হাতে পেয়েছে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা। আর সেই দরজায় কড়া নাড়ার নাম—স্বপ্ন।

রাউজান উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুম কবির, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মনির হোছাইন।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com