শাহীন আহমেদ
একটি হৃদয়—যেখানে প্রতিদিন জায়গা পায় অসহায় মানুষের আর্তনাদ, বঞ্চিতদের নীরব কান্না আর স্বপ্নহারা মানুষের নতুন করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। যে হৃদয় শুধু অনুভব করে না, বরং সেই অনুভূতিকে রূপ দেয় কাজে, সিদ্ধান্ত নেয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকারে। এমনই এক মানবিক হৃদয়ের অধিকারী চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তার গল্প কেবল একজন প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের গল্প নয়—এটি এক মানুষ হয়ে ওঠার গল্প, এক আলোকবর্তিকার গল্প। আজ তিনি শুধু প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নন, অসহায় মানুষের কাছে এক আশ্রয়ের নাম, এক নির্ভরতার প্রতীক। যেখানে অন্যরা দায়িত্বের গণ্ডিতে আবদ্ধ, সেখানে তিনি দায়িত্বের সীমা ভেঙে পৌঁছে যান মানুষের হৃদয়ে।
তার দরজায় আজ ভিড় করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ—কারও চোখে দুঃখ, কারও কণ্ঠে অসহায়ত্ব। কিন্তু সেই দরজার ভেতরে প্রবেশ করলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সেখানে পাওয়া যায় সহানুভূতি, শোনা হয় কথা, আর নেওয়া হয় সমাধানের উদ্যোগ। তিনি শুধু শোনেন না—তিনি পাশে দাঁড়ান।

নারায়ণগঞ্জ শহরের দোয়েল প্লাজা এলাকায় শতবর্ষী ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে দেখা করে তার মাথায় স্নেহভরে হাত রাখেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কঠিন জীবনের গল্প শুনে সরেজমিনে গিয়ে তিনি খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেন। বৃদ্ধা জানান, ভিক্ষা নয়, পরিশ্রম করেই বাঁচতে চান। মানবিক এই স্পর্শ মানুষের জীবনে আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। ছবি: সংগৃহীত।
শীতের গভীর রাতে শহরের আলো পেছনে ফেলে তিনি পৌঁছে যান জেলেপল্লীর অন্ধকারে, হাতে নিয়ে কম্বল। বৃদ্ধাশ্রমে ফল নিয়ে হাজির হন, এতিম শিশুদের কোলে তুলে নেন পিতৃস্নেহে। প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার, দরিদ্র মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় পরিবারের বিয়ের আয়োজন—তার প্রতিটি উদ্যোগ যেন মানবতার একেকটি জীবন্ত উদাহরণ।
একজন শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি মালিকের মেশিন বিক্রি করতেও পিছপা হননি—এমন সাহসী সিদ্ধান্ত ইতিহাসে বিরল। আবার শতবর্ষী এক বৃদ্ধা, যিনি ভিক্ষা নয়—পরিশ্রমে বাঁচতে চান, তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়েছেন সম্মানের মূল্য কত বড় হতে পারে।

চট্টগ্রামের জেলেপল্লীতে গভীর রাতেও শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, এক নারীর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে শীত নিবারণ করেন। আকমল আলী ঘাট, রানী রাসমনির ঘাট ও উত্তর কাট্টলী এলাকায় দরিদ্র জেলে পরিবারসহ অসহায় মানুষদের হাতে সরাসরি শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়ায় ফুটে ওঠে মানবিক নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ। ছবি: সংগৃহীত।
জাহিদুল ইসলাম মিঞা বুঝেছেন—মানবতা কোনো দয়া নয়, এটি দায়িত্ব; এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা। আর সেই দায়বদ্ধতাকেই তিনি নিজের জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছেন।
তিনি সবসময় হাস্যোজ্জ্বল, সহজপ্রাপ্য, এবং আন্তরিক। পথশিশু থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগী—সবাই তার কাছে সমান গুরুত্ব পায়। তার অফিস কেবল একটি প্রশাসনিক দপ্তর নয়, এটি যেন অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে কেউ ফিরে যায় না খালি হাতে বা ভাঙা মন নিয়ে।
তার কাজের ভেতরে আছে এক ধরনের নীরব শক্তি—যা মানুষকে সাহস জোগায়, আশা দেখায়। তিনি যেন হতাশার অন্ধকারে একটুকরো আলো, যা মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শারীরিক প্রতিবন্ধী দম্পতি সাইরা তাসসিন ও শহিদুল আলমের হাতে নতুন অটো রিকশা তুলে দেন জেলা পরিষদ। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সুপারিশে এই সহায়তা তাদের জীবিকা পুনরুদ্ধারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। ছবি: সংগৃহীত।
এই সময়ে, যখন মানবিকতার সংকট নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বারবার, তখন জাহিদুল ইসলাম মিঞা হয়ে ওঠেন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তার প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষ চাইলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি শুধু একজন জেলা প্রশাসক নন—তিনি এক অনুভূতি, এক অনুপ্রেরণা, এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি মানবিক বাংলাদেশের।
তার নাম একটি পরিচয় নয়—একটি বার্তা। তার জীবন একটি গল্প নয়—একটি চলমান মানবিক আন্দোলন।
লেখক: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।