June 27, 2026, 6:52 am

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের আশঙ্কা

  • Update Time : Monday, March 2, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন, রপ্তানি পরিবহনে জটিলতা এবং প্রবাসী শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপে পড়তে পারে।

জ্বালানি আমদানি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি আমদানি উৎস হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, এলএনজি ও এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশীয় বাজারে প্রভাব ফেলবে।

ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি ওপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা এখনও আমদানিনির্ভর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তার ভাষায়, “যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব।”

বৈদেশিক লেনদেন ও রিজার্ভে চাপ

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে।

নৌপথে বিঘ্নের শঙ্কা

বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, “বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার হয়।” তিনি জানান, এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌপথ Suez Canal যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের চাপে পড়বে।

লোহিত সাগরে হুতি হামলার কারণে ইতোমধ্যে অনেক জাহাজ বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই বেড়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

পোশাক খাতে সম্ভাব্য প্রভাব

বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পোশাক রপ্তানিকারকেরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রথমত, যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে, যা পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা কমাবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করতে হলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে সামগ্রিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন ধারণা ছিল, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও রপ্তানি বাজারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কমিয়ে দিতে পারে।

ইরান বাজারে রপ্তানি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইরানের প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে প্রায় ১০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর বেশিরভাগই তৈরি পোশাক ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি, রপ্তানি, আমদানি, রিজার্ভ ও শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে বাড়তি সতর্কতা ও বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com