নিজস্ব প্রতিবেদক:
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাসভিত্তিক হিসাবে রপ্তানিতে ধীরে ধীরে গতি ফিরলেও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এখনো নিম্নমুখী প্রবণতা কাটেনি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রভাবে সামগ্রিক রপ্তানি আয় পিছিয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি মাসে রপ্তানি আয় আগের মাস ডিসেম্বরের তুলনায় ৪৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। তবে বছরওয়ারি তুলনায় জানুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। এর ফলে টানা ছয় মাস ধরে আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি কম থাকার ধারাই অব্যাহত রইল।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে সেই প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। অক্টোবর মাস থেকে মাসওয়ারি হিসাবে রপ্তানি বাড়লেও তা আগের বছরের তুলনায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে রপ্তানি বেড়েছিল ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। নভেম্বরে অক্টোবরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয় ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ডিসেম্বরে নভেম্বরের তুলনায় ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বরের তুলনায় ১১ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে।
তবে গত অর্থবছরের একই চার মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গত বছরের অক্টোবরে ৯ শতাংশ, নভেম্বরে ১৬ শতাংশ, ডিসেম্বরে ১৮ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ফলে চলতি বছরের মাসওয়ারি উন্নতি সত্ত্বেও বছরওয়ারি হিসাবে পিছিয়ে রয়েছে রপ্তানি।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ সাত মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার।
রপ্তানি কমার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে ২ হাজার ২৯৮ কোটি ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার।
একক মাস হিসেবে জানুয়ারিতেও তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মাসটিতে আয় হয়েছে ৩৬১ কোটি ডলার, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৩৬৬ কোটি ডলার। পোশাকের মধ্যে গেঞ্জি জাতীয় পোশাকের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় কিছু ক্রেতা তাদের অর্ডারের অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে এসব ক্রয়াদেশ পুনরায় ফিরে আসবে।
অন্যদিকে মোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ কবীর বলেন, পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কভার বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়েছে এবং রপ্তানিতে গতি কমেছে। বিশেষ করে মৌলিক পোশাক উৎপাদনকারী কারখানাগুলো বেশি চাপে রয়েছে। পাল্টা শুল্কের পাশাপাশি ইউরোপ ও নতুন বাজারে চীন ও ভারতের আগ্রাসী বাণিজ্যও বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য কয়েকটি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম সাত মাসে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। তবে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ, পাট ও পাটপণ্যে ১২ শতাংশ এবং হোমটেক্সটাইল খাতে প্রায় ৫ শতাংশ রপ্তানি আয় বেড়েছে।
রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। তবে নীতিগত সহায়তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।