নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৬ সালের শুরুতেই চীনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। টানা শুল্ক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ২০২৫ সালে দেশটির রপ্তানি কমেনি—বরং বেড়েছে। এর ফল হিসেবে চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই তথ্য প্রকাশের পরদিনই নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ঈশ্বর প্রসাদ সতর্ক করে বলেন, মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে চীনের এই বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। তার মতে, সস্তা চীনা পণ্যের ঢল শুধু উন্নত দেশ নয়, বরং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকেও চরম প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়েও প্রবৃদ্ধির জন্য এভাবে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বৈশ্বিক নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে।
তবে চীনের ভেতরে এই বিশাল উদ্বৃত্তকে ভিন্ন চোখে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক সম্পাদক হু সিজিন একে ‘ওয়াশিংটনের অভিজাত শ্রেণির আতঙ্ক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, শুল্ক বা বাণিজ্য যুদ্ধের মাধ্যমে চীনের অর্থনীতিকে দমন করা সম্ভব নয়—কারণ দেশটির রপ্তানি কোনো সামরিক শক্তি বা জোরজবরদস্তির ফল নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উৎপাদন সক্ষমতার ফল।
কেন বাড়ছে উদ্বৃত্ত
চীনের এই রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পেছনে দুটি প্রধান কারণ স্পষ্ট—শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ এবং দুর্বল আমদানি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে রেকর্ড ২৫.৮ শতাংশ।
এর পাশাপাশি চীনের উৎপাদন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাসঙ্কোচন এবং ইউয়ানের অবমূল্যায়নের কারণে চীনা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে আমদানি বেড়েছে মাত্র ০.৫ শতাংশ, যেখানে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১ শতাংশ।
এই ব্যবধানের বড় কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে চীনে খুচরা বিক্রির প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং নভেম্বরে নেমে এসেছে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ১.৩ শতাংশে। আবাসন খাতের সংকটে স্থির সম্পদে বিনিয়োগও হ্রাস পেয়েছে, যা আমদানিকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের সাত মাসে চীনের মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে—যা আগের বছরে ঘটেছিল মাত্র একবার। এতে স্পষ্ট হয়, এই পরিস্থিতি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়।
সুফল ও ঝুঁকি—দুটোই
এই বিশাল উদ্বৃত্ত একদিকে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি শক্তির প্রমাণ। এটি চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সচল রেখেছে এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের এই সময়ে সাশ্রয়ী দামে চীনা পণ্য বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তির উৎস হয়ে উঠেছে।
তবে অন্যদিকে এটি চীনের রপ্তানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের ঝুঁকিও সামনে এনেছে। অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে চীন এমন এক দুষ্টচক্রে পড়তে পারে, যেখানে বৈশ্বিক চাহিদার ওপর অতিনির্ভরশীলতা বাড়বে। এর ফলে বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে এবং চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে শুল্ক ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা আগেই সতর্ক করেছেন, চীন যদি রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে সরে না আসে, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বাড়বে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও জানিয়েছেন, ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা দূর না হলে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথে হাঁটতে পারে ইউরোপ।
এই প্রেক্ষাপটে বেইজিংও নড়েচড়ে বসেছে। প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং আমদানি বাড়ানো ও বাণিজ্যে ভারসাম্য ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও জানিয়েছেন, সমন্বিত বাণিজ্য মেলা ও লক্ষ্যভিত্তিক ক্রয়ের মাধ্যমে আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি পণ্যে রপ্তানি ভ্যাট রিবেট কমানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক নিয়ে সমঝোতার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে চীন।
শেষ কথা
চীনের এই রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ না অভিশাপ হবে—তা নির্ভর করছে রপ্তানি আয়ের কতটা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ফিরছে এবং আমদানি ও বাজার উন্মুক্তকরণে কতটা ভারসাম্য আনা যায় তার ওপর। বাস্তবতা হয়তো হু সিজিনের মতো অতটা আশাবাদী নয়, আবার ঈশ্বর প্রসাদের আশঙ্কার মতো সম্পূর্ণ অন্ধকারও নয়। তবে একথা নিশ্চিত—এই উদ্বৃত্তকে সামাল দেওয়া এখন চীন ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।