নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘অধিক ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটের ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, সরকারের উপস্থাপিত বাজেট বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেই রাজস্ব কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণের উৎস নিয়েও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে দেশীয় ব্যাংকিং খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার যখন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, তখন শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রাপ্যতা কমে যায়। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান বাধার কথা উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তার ভাষ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শিল্প ও ব্যবসা খাতসহ পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর সাফল্য না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। দলটির মতে, পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি কাজ করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। এতে প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম ব্যক্তিগত করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
তার দাবি, মূল্যস্ফীতির কারণে যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, তখন করের বোঝা বাড়ানো জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
একই সঙ্গে শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামাল, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতে কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারি বাজেটের তুলনাও তুলে ধরা হয়। দলটির দাবি, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা, যা সরকারি বাজেটের তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কম।
জামায়াতের মতে, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ রাখা হয়েছিল, যেখানে সরকারি বাজেটে তা ৩.৫ শতাংশ। ফলে তাদের বাজেট তুলনামূলকভাবে কম ঋণনির্ভর এবং বাস্তবসম্মত বলে দাবি করেন নেতারা।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে সরকারকে প্রস্তাবিত বাজেট পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বর্তমান বাজেটকে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণকেন্দ্রিক করার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা উচিত।