June 27, 2026, 6:09 am

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান

  • Update Time : Wednesday, June 3, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। এ বিজয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেন। মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯ ভোট, আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। মাত্র আট ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেন তিনি।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ওই অধিবেশনের পুরো সময়জুড়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই বিজয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেও এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে।

এ নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। প্রায় চার দশক পর আবারও সেই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বাংলাদেশের প্রতিনিধির প্রত্যাবর্তন ঘটল।

দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী খলিলুর রহমান কর্মজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড)-এর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী ২৫ বছর নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় জ্যেষ্ঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন নীতিগত ও গবেষণাধর্মী প্রকাশনার প্রধান লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের বিজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ (আরএসএ) বা পারস্পরিক ভোট-সমর্থন ব্যবস্থা। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কূটনৈতিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ফলেই বাংলাদেশ তুলনামূলক স্বল্প সময়ের প্রচারণা চালিয়েও প্রয়োজনীয় সমর্থন অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি খলিলুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কার্যক্রম জোরদার করে। বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকেই এই পদের জন্য প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।

নির্বাচনে জয়ের পর খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খলিলুর রহমান বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, সংলাপ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেবেন।

বাংলাদেশের এ সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন, ভারত ও পাকিস্তানও। ঢাকায় চীনের দূতাবাস এক বিবৃতিতে ভবিষ্যতে অভিন্ন অগ্রাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে খলিলুর রহমানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকার এ ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মূলনীতি, বহুপাক্ষিকতা, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com