নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার, যা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, সংবিধানে সংশোধনী আনার জন্য সরকার ১২ সদস্যের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধীদলের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম চাওয়া হয়েছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিএনপি থেকে সাতজন এবং অন্যান্য দল থেকে পাঁচজন নিয়ে ১২ সদস্যের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বিরোধীদল তাদের পাঁচজন সদস্য মনোনীত করলে মোট ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা সম্ভব হবে।
সংসদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানান দ্রুত নাম প্রস্তাব করার জন্য, যাতে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যায়।
তবে বিরোধীদল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময় চেয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে তারা ‘সংস্কার’-এর পক্ষে। এ বিষয়ে দলীয়ভাবে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। আমরা এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছি না। পরে জানাবো।” পাশাপাশি তিনি অতীতেও এই ইস্যুতে মতবিরোধ ছিল বলে উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে নমনীয় অবস্থান জানিয়ে বলেন, সরকার বিরোধীদলের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে এবং প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে।
সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার প্রশ্নটি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গত ৩১ মার্চ সরকার পক্ষ থেকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সর্বদলীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সমালোচিত হয়।
বিরোধীদল পৃথকভাবে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী, ১৩তম জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা পালনের কথা ছিল—একদিকে সংসদ সদস্য, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে উল্লেখিত ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাব নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও এখনো সেই পরিষদ গঠিত হয়নি।
এছাড়া, নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে বিরোধীদলের সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি করে, যেখানে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রস্তাবগুলোর কিছু বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সম্প্রতি এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় বিরোধীদল মনে করছে, সংসদ শুধু আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি কার্যকর সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করা উচিত।
সব মিলিয়ে, সংবিধান সংশোধন না সংস্কার—এই বিতর্কে সরকার ও বিরোধীদলের অবস্থান এখনও ভিন্নমুখী। ফলে প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটি গঠন ও এর কার্যক্রম কত দ্রুত এগোবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর।