আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার প্রধান সামরিক লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুক্রবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তিনি আপাতত যুদ্ধবিরতির পক্ষে নন। “যখন আপনি আক্ষরিক অর্থেই প্রতিপক্ষকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছেন, তখন যুদ্ধবিরতির কোনো প্রশ্নই আসে না,” মন্তব্য করেন তিনি।
তবে পরে ফ্লোরিডার পাম বিচে যাওয়ার পথে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘বিশাল সামরিক অভিযান’ গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন লক্ষ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারকারী দেশগুলোকেই এর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র সেই তালিকায় নেই। উল্লেখ্য, ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর আগে ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তারা এই প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তিনি বিষয়টিকে ‘সহজ সামরিক কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করে মিত্রদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
যদিও ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, পেন্টাগন ইতোমধ্যে ইরানে সম্ভাব্য স্থলবাহিনী মোতায়েনের বিস্তারিত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এতে বন্দী ইরানি সেনাদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্রায় আড়াই হাজার নৌসেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল বা অবরোধের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে—যেখানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল অবস্থিত।
এদিকে, গবেষণা সংস্থা Center for Strategic and International Studies-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান জানিয়েছেন, অতিরিক্ত মার্কিন সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে এক সপ্তাহ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, তাদের বাহিনী শত্রুপক্ষকে ‘চরম নাস্তানাবুদ’ করেছে। তিনি বলেন, ইরানিদের ঐক্যের কারণেই এই সাফল্য এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক হামলা চালানোর পর থেকেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে ট্যাঙ্কারে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে আনা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার—এই দ্বৈত অবস্থানই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে জ্বালানির ঊর্ধ্বগতির প্রভাব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করছে, যা আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।