June 27, 2026, 7:11 am

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৯৫, আহত ১১ হাজারের বেশি

  • Update Time : Wednesday, February 4, 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালে গত ১৭ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনের মূল তথ্য উপস্থাপন করেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত

প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য ১৭ মাসে দেশে মোট ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১৯৫ জন এবং আহত হন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, দলীয় কোন্দল, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং স্থাপনা দখলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দল হিসেবে বিএনপির নাম উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির সদস্য ও সমর্থকরা ৭০ শতাংশ, আওয়ামী লীগের ১৭ শতাংশ এবং বাকিরা অন্যান্য দল ও অজ্ঞাত পরিচয়ের বলে জানানো হয়েছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে অন্তত ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন।

গণপিটুনি ও মব সহিংসতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে সারাদেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার অন্তত ৪১৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতির সন্দেহে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি কিশোরদেরও গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে।

রাজধানীসহ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত এসব ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, গত ১৭ মাসে ৪২৭টি ঘটনায় অন্তত ৮৩৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও হামলার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন নিহত এবং ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হুমকির ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় অন্তত ৪১টি মামলায় ৬৯ জন অভিযুক্ত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব মামলার অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতকে কেন্দ্র করে হয়েছে বলে জানানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কারা হেফাজত ও সীমান্ত পরিস্থিতি

প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। আলোচ্য সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, নির্যাতন ও হেফাজতে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১২৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে জানানো হয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং মিয়ানমার সীমান্তে হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

গত ১৭ মাসে নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা মারাত্মকভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে অন্তত ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজারের বেশি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও হামলা, মন্দির ভাঙচুর ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া মাজার, বাউল ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনাকেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ

এইচআরএসএস বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। প্রতিবেদনে অবাধ মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ, জবাবদিহিমূলক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সংখ্যালঘু ও পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Spread the love
More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by Duronto Bangla
Theme Developed BY ThemesBazar.Com